মেনু নির্বাচন করুন

ছবি
শিরোনাম
দামিহা বকুল চৌধুরী বাড়ি
বিস্তারিত

শ্যামার পুকুর

ভাটীর কন্যা তাড়াইল এর গৌরব করার মত শত সহস্র উপাদানের ঐতিহ্য সমৃদ্ধ জনপদকে ঘিরে থাকলেও সংরক্ষণের অভাবে বিস্মতির অতল তলে হারিয়ে গেছে কত লোকজ ঐতিহ্য ও লোকজ কাহিনী। তদান্তীন পাকিস্তানের স্বাধীনতার উত্তরকালে বৃহত্তর ময়মনসিংহের সাংস্কৃতি বিশেষ করে যাত্রাপালার সুতিকাগার হিসাবে পরিচিত ছিল দামিহার উমেশ চৌধুরীর পরিচালিত উমেশ কোম্পানী নামে অপেরার দল।তাছাড়া প্রতি বৎসর শারদীয় পূজাতে এলাকার গ্রাম্য যাত্রাগানের প্রতিযোগিতা হতো এবং উমেশ চৌধুরীর পৃষ্ঠ পোষকতায়। তার বাড়ীর নাট্য মঞ্চে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিজয়ীদলকে পুরস্কৃত করা হতো। যার ফলে অত্র অঞ্চলে তৎকালীন সময়ে গান-বাজনা, নাটক থিয়েটার ও যাত্রার পটভূমি হিসাবে অত্র অঞ্চল খ্যাতি লাভ করে। চৌধুরী বাড়ীর বাসস্থান হিসাবে এলপ্যাটানে জাফরী ইটের দ্বারা নির্মিত ইমারতটি এখনো চৌধুরীর ঐতিহ্যের কালের স্বাক্ষী হিসাবে বিদ্যমান আছে। তার উত্তরাধীকার হিসেবে বর্তমানে রাজু চৌধুরী, দেবু চৌধুরী এখানে অবস্থান করছে। উমেশ চৌধুরীর বাসবভনেই ছিল নাচ মহল ও রঙমহল। ইমারতটির সামনে ছিলনাটক শালা। বর্তমানে ইমারতটি বসবাসের অনুপযোগী অবস্থায় আছে। নাছমহল আর রঙমহল বর্তমানে বিষধর সর্পকুল এবং ছামচিকার রাজত্ব চলছে। কথিত আছে যে, উমেশ চৌধুরীর যাত্রা দলের অপেরার সাজ সরঞ্জামাদি বহন করতে দু’টি নৌকা লাগিত।১৯৭১ সনে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এসকল সরঞ্জামাদিলুট হয়ে যাওয়ার ফলে অপেরায় ব্যবহৃত স্থতিচিহ্ন আর নেই। উমেশ চৌধুরীর অপেরাতে যাত্রাপালা হিসাবে ঈশাখা, কেল্লাতাজপুর, নবাব সিরাজউদদৌল্লা, ভাওয়াল সন্যাসী, কাজল রেখা, মহুয়া ও কাঞ্চনমালা ইত্যাদি পালা অভিনীত হতো। উক্ত অপেরাতে নায়িকা হিসাবে শ্যামার অভিনয় এখনো লোকমুখে শুনা যায়। বিভিন্ন পূজা পার্বনের সময় নাটক ও যাত্রা অনুষ্ঠানে এলাকার জমিদারদের স্ব-পরিবারে যাত্রার আসরে আমন্ত্রিত হতো। শ্যামার অভিনয় ও নৃত্যের যশ চারিদিকে ছড়িয়ে ছিল। যাত্রার আসরে শ্যামাছিল আলোকের অগ্নি শিখা পুরুষ ছিল আত্মভোলা পতঙ্গের মতো। তার রূপের আগুনে কত পুরুষ ভষ্ম হয়েছে তার কোন ইয়াত্তা নেই। অভিনয়ের মাধ্যমে অনেক জমিদারদের নিকট থেকে প্রচুর ইনাম পেত। তার এই বাইজি জীবনের সঞ্চিত সমস্ত ধন-সম্পদ তার শেষ জীবনে জনগণের দুঃখ-কষ্ট লাঘবের জন্য দান করে গেছেন। তার যৌবন যখন বসন্তে নীলছে আকাশে শারদীয় মেঘ, শিউলির রাঙা প্রভাত আর কুয়াশার শুচি শুভ অনিন্দ্যময় পুষ্পর সুরক্ষিত অবস্থার যবনিকাপাত করে বার্ধক্যে উপনীত হলো। মহাকালের বিশাল স্রোতধারার একটি মানুষের আয়ুস্কাল অতিতুচ্ছ। এরূপ জীবনের মাঝেও মানুষ তার মহৎকর্মকান্ডের দ্বারাই এ নশ্বর পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করে। শ্যামা বাঈজীও এই অমরত্বে আশায় খানম করেছিল একটি পুরুষ। যাকে বর্তমানে শ্যামা পুকুর বলে ডাকে। নারীর পূর্ণত্ব হয় মাতৃত্বে একথা অনুধাবন করেই শ্যামারবাঈজির তার জীবন সায়াহ্নে এসে নারীত্বে মাতৃত্বস্বাধ পূর্ণত্ব করতে চেয়েছিল। কবসী জেননা হিসাবে জীবন কেটেছে তার। সমাজের কাছে এপংখিল জীবন নারীত্বের মর্যাদা দেয়নি। যার যৌবন বসন্তে যাত্রার আসরে হাজার হাজার শ্রুতা বিমোহিত হতো তার অভিনয়ে। অভিনয়কালে কত লোক কত ইনাম দিয়েছে, বাহাবা দিয়েছে কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে আর সাধারণ নারীর মতো তার নারীত্বের মর্যাদা দেয়নি। সমাজের কাছে ছিল সে একজন বাঈজী। ধনাট্যের রক্ষিতা ললনা। তার অতিবাহিত জীবন তরীয়ে ভুলপথে চলেছিল। সে পথ ছিল পংখীল। জরাজীর্ণ, ভংগুর, মিথ্যা মরিচীকা। যে পথের কোন ঠিকানা নেই, নেই চলার শেষ, অসমাপ্ত থেকে যায় নারীর জীবন আলোচ্য। কবির ভাষায় বলতে পারিঃ

জগৎঘুরিয়ে দেখি নু সকল ঠাই

বিষাদ হয়ে গিয়েছে বিশ্ব পাপের অন্তনাই

অতি নির্বোধ গর্বিত নারীসে গর্ভদাসী

ভালবেসে তার শ্রান্তি না হয় পূজিতে না আসে হাসি।

লালসা লোলুপ পুরুষ কঠোর স্বার্থপর,

বাদীর বান্দা নরকের ধারা পংখে তাহার ঘর।

 

তাইতো শ্যামা বাঈজীর মাতৃত্ব হৃদয় উতলিয়ে উঠিল তার অতীত দিনের ফেলে আসা পংখিল জীবনের কথা। যারা তার গান শুনে, অভিনয় দেখে বাহবা দিতো, তারাই শেষ জীবনে তাকে রক্ষিতা বাঈজী বলে ছিঃছিঃ করছে। এত বিভৎস্যজীবন নিয়ে তিলে তিলে বিবেকের তাড়নায় শংকিত হতে থাকে। মনের বেদনা দৈহিক বেদনা থেকে আরও ভয়ংকর। বেদনা হচ্ছে পাপের শ্রান্তি। তার মৃত্যুর পর লোকে তাকে ঘৃণা ভরেস্মরণকরবে তার কোন অস্তিত্ব থাকবেনা এধরাধামে। তাই তার মনের বাসনা হল হত দরিদ্র জনগণের কল্যানার্থে একটি পুকুর খনন করে যাবে। যাহাতে সব কাজের শেষে সারা দিনের ক্লান্তি দুর করবে দরিদ্র জনগন। সন্তান যেমন সারাদিন খেলাধূলা করে ক্লান্তি লয়ে মায়ের কোলে স্বত্ত্বি পায়। তেমনি সারাদিনের পরিশ্রান্ত হয়ে জনগণ পুকুরের পানিতে জবগাহ করে দেহের ক্লান্তি দুর করে শ্রান্তি ফিরে পাবে। ফলে মায়ের স্নেহের শূন্যতা দূর হবে এবং এই মাতৃত্বজয়ী কল্যাণ নিয়েই পুকুর খনন করেছিল। জীবন সায়াহ্নে মাতৃপাগল শ্যামা বাঈজী। মা হলেন বর্ষা ঋতু। জলদান করে, ফলদান করে, নিবারন করে তাপ, উর্দ্ধোলোক থেকে আপনাকে দেয় স্তম্ভিত করে, দূর করে শুষ্কতা, ভরিয়ে দেয় অভাব আর প্রিয় বসন্ত ঋতুর গভীরতা। রহস্য মধুর মায়ামাত্র, তার চাঞ্চল্য রক্তে রক্তে তোলে তরঙ্গ, পৌছায় চিত্তের সেই মণি কোটায়, যেখানে সোনার বীণায় একটি নিভৃত তার রয়েছে নিরবে, ঝঙ্কারের অপেক্ষায়, যে ঝঙ্গারে বেজে উঠে সর্বদেহ মনে অনির্চনার বাণী। জীবনের অন্তিম সময়ে এসে উমেশ চৌধুরীর কাছে তার মনের বাসনা জানায় এবং জীবনের সঞ্চিত সমস্ত অর্থ তার হাতে তুলে দেয় পুকুর খননের জন্য জন্য। শ্যামার অন্তিকালের বাসনা অনুযায়ী উমেশ চৌধুরী তার বাড়ীর পূর্ব-দক্ষিণ পার্শ্বে একটি পুকুর খনন করেন।

 

শ্যামা বাইজীর জীবনের প্রয়োজনে তার পক্ষে সমাজের নিষিদ্ধ পথে, পাপের সংগীয়তার পা বাড়িয়েছিল। জীবন সায়াহ্নে এসে তার অতীব পংখিল জীবনের পংখীলতা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য শেষ বয়সে জনকল্যাণ কাজে ব্রতী হয়েছিল। যার ফলে তার অনুত্যাগের অমিত ধারা নারীর মাতৃত্ব থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চেয়েছিল। তার এহেন ধারনা অন্তিম সময়ে তাকে কলুষ মুক্ত করবে। তাইতো কবির ভাষা বলতে পারি “পাপীকে নয়, ঘৃণা কর পাপকে।”

বর্তমানে শ্যামা পুকুরটি আগের মত শ্রীনেই, চারদিকে নিপা, তমালসহ হরেক রকমের তরুদল লতায়-পাতায়পূর্ণ ছিল। পুকুরটির স্বচ্ছ শলিলে মৃদমন্ধ হাওয়ায় দুলে ছোট ছোট ঊর্মি মালাগুলি যেন শ্যামা বাঈজীর নৃত্যু অনুস্মরণ করছে বলে মনে হয়। এখনোও নাকী  মাঝে মধ্যে পুকুর পাড়ে গভীর রজনীতে শ্যামার পায়ের নূপুরের ঝংকার শুনা যায় বলে জনশ্রুতি আছে। এখন আর চৌধুরী বাড়ীর জমিদারী নেই। এখন স্মৃতি হিসাবে আছে জড়াজীর্ণ রঙমহলের প্রাসাদটি যেখানে ঝংকিত হতো নর্তকীদের নূপুরের ধ্বনী আর তাদের সুরেলা কন্ঠ সুমধুর সংগীত। আজ সেখানে বিষধর সাপের আবাস। অনেকে ভয়ে সেখানে যেতে চায়না। সাংস্কৃতিক ভুবনে ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বাড়ীর কথা এখনও যাত্রাদ্যোগী মুরব্বীদের মুখে শুনা যায়। শুনা যায় নয়ন ভুলানো নর্তকী শ্যামা বাইজীর সুরেলা কন্ঠের বিমোহিত রাগিনীর কথা। কালের গর্ভে জমিদারীর ঐতিহ্য বিলীন হলেও হাজার হাজার জনগণের স্বস্তিত্বে পুকুরটি শ্যামার স্মৃতি বহন করে আসছে।

 

(বিঃদ্রঃ উল্লেখিত চৌধুরী বাড়ির তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে শীর্ঘই লেখা হবে।)

 

মোঃ সিরাজুল হক মিয়া

সিএ

ইউএনও অফিস, তাড়াইল।